থ্যালাসেমিয়া (ইংরেজি: Thalassemia)

Banner image of থ্যালাসেমিয়া post showing red blood cells

ভূমিকা

থ্যালাসেমিয়া  একটি প্রচ্ছন্ন জিনঘটিত বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা বা “অ্যানিমিয়া”তে ভুগে থাকেন।থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। এটি যেমন কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, তেমনি রক্তের ক্যানসারও নয়। জিনগত ত্রুটির কারণে এই রোগে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় বলে লোহিত রক্তকণিকা সময়ের আগেই ভেঙে যায়। ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।থ্যালাসেমিয়ার উপসর্গগুলো মূলত রক্তস্বল্পতাজনিত উপসর্গ। যেমন ক্লান্তি, অবসাদ, শ্বাসকষ্ট, ফ্যাকাশে ত্বক ইত্যাদি। রক্ত অধিক হারে ভেঙে যায় বলে জন্ডিস হয়ে ত্বক হলুদ হয়ে যায়। প্রস্রাবও হলুদ হতে পারে।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি নারী-পুরুষ নিজের অজান্তে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার  শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মায়।যেহেতু এই মরণব্যাধি তে , রোগীরা মূলত রক্ত সল্পতায় ভোগে , প্রতি দুই থেকে চার সপ্তাহ পরপর তাদের নিয়মিত রক্ত নিতে হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওষুধ এবং অন্যের কাছ থেকে রক্ত নিতে হয়। এটি আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। সত্যিকার অর্থে থ্যালাসেমিয়া রোগের স্থায়ী চিকিৎসা নেই। এই রোগের স্থায়ী চিকিৎসা হচ্ছে ‘ব্যোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন ও জীন থ্যারাপি। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।অথচ একটু সতর্কতা অবলম্বন করা হলেই এই মর্মান্তিক পরিণতি এড়ানো যাবে। তাই রোগটি প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি আমাদের সবার দায়িত্ব।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। বাবা অথবা মা  অথবা মা-বাবা উভয়েরই থ্যালাসেমিয়া জিন থাকলে বংশানুক্রমে এটি সন্তানের মধ্যে ছড়ায় |

থ্যালাসেমিয়া লক্ষণ

জন্মের পর পরই এ রোগ ধরা পড়ে না। শিশুর বয়স এক বছরের বেশি হলে বাবা-মা খেয়াল করেন শিশুটি ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে,  বাড়ছে শিশুর দুর্বলতা,  শিশু অবসাদ অনুভব করছে। শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে,  ত্বক হলদে হয়ে যাচ্ছে (জন্ডিস), মুখের হাড়ের বিকৃতি হচ্ছে, ধীরগতিতে শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছে, পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হচ্ছে ও গাঢ় রঙের প্রস্রাব হচ্ছে।

থ্যালাসেমিয়া হলে শিশুর শরীরে কী ঘটে

এই রোগে আক্রান্ত শিশুর শরীরে হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায় এবং অস্থিমজ্জার পক্ষে একই হারে লোহিত কণিকা তৈরি সম্ভব হয়ে ওঠে না। এতে একদিকে যেমন রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্লীহা আয়তনে বড় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে হার্ট,  প্যানক্রিয়াস,  লিভার, অণ্ডকোষ ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। বার বার রক্ত পরিবর্তনের কারণে থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের রক্ত বাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন-হেপাটাইটিস হতে পারে, অস্থিমজ্জা প্রসারিত হয়ে যায় এবং এতে হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। এতে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

থ্যালাসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে যারা

যাদের শরীরে থ্যালাসেমিয়া রোগের জিন (gene) আছে,  কিন্তু রোগের কোনো উপসর্গ প্রকাশ পায় না,  তাদের থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক বলা হয়। এরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। তবে এরা এদের সন্তানদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিস্তার ঘটায়। পিতা-মাতা উভয়েই বাহক হলে থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। কাজেই বিয়ের আগে সবারই জেনে নেওয়া দরকার, তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না।

থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক জানার জন্য যা করবেন

রক্তের বিশেষ ধরনের পরীক্ষা হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস দিয়ে আমরা এই রোগ নির্ণয় করতে পারি। বিবাহ পূর্ববর্তী সময়ে পাত্র ও পাত্রী উভয়কেই এই রক্ত পরীক্ষা করে নিতে হবে l

প্রতিরোধ

    • দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে হবে।
    • যদি পরিবারের কোনো সদস্যের থ্যালাসেমিয়া রোগের ইতিহাস থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভধারণ করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
    • থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করা। এ জন্য স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করে বাহকদের চিহ্নিত করে পরামর্শ দিতে হবে। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোনো শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সম্ভব নয়।
    • প্রতিরোধের একমাত্র উপায় বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা। থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী নারী গর্ভধারণ করলে তার সন্তান প্রসবের আগে অথবা গর্ভাবস্থায় ৮ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রি-মেটাল থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করিয়ে নিতে হবে। এ পরীক্ষার যদি দেখা যায়, অনাগত সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে সন্তানটির মারাত্মক পরিণতির কথা ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা যেতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া Image showing the possibility of carrying থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) gene if one parent is a carrier.

যখন পিতা বা মাতার মধ্যে এক জন থেলাসেমিয়া র বাহক হন , তখন আগত স্তনের কেউই থেলাসেমিয়ায় আক্রান্ত হন না l তবে তারা থেলাসেমিয়ার বাহক হতে পারেন l একটি ছবির মাধ্যমে তা বোঝানো হলো |

Image showing the possibility of carrying থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) gene if both the parents are carriers.

কিন্তু যদি আগত সন্তানের পিতা -মাতা উভয়েই থেলাসেমিয়ার বাহক, তবে আগত সন্তানদের মধ্যে থেলাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা পুরো মাত্রায় থাকে l একটি ছবির মাধ্যমে তা বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে l

প্রতিরোধের উপায়

  • দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই রোগ সম্বন্ধে সচেতন করে তুলতে হবে।
  • যদি পরিবারের কোনো সদস্যের থ্যালাসেমিয়া রোগের ইতিহাস থাকে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভধারণ করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
  • থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করা। এ জন্য স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করে বাহকদের চিহ্নিত করে পরামর্শ দিতে হবে। দুজন বাহক যদি একে অন্যকে বিয়ে না করে তাহলে কোনো শিশুরই থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করা সম্ভব নয়।
  • প্রতিরোধের একমাত্র উপায় বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা। থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী নারী গর্ভধারণ করলে তার সন্তান প্রসবের আগে অথবা গর্ভাবস্থায় ৮ থেকে ১৪ সপ্তাহের মধ্যে প্রি-মেটাল থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করিয়ে নিতে হবে। এ পরীক্ষার যদি দেখা যায়, অনাগত সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তবে সন্তানটির মারাত্মক পরিণতির কথা ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা যেতে পারে।

আপনি কুশলের ওয়েবসাইটে আরও গর্ভাবস্থার সুস্থতার সহায়তা টিপস পেতে পারেন।

Acknowledgement: NHS, UK

Image source: Pixabay

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *